স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ত’থ্য জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। ক’রোনা রো’গীর সংখ্যা, রো’গ শনাক্তকরণ পরীক্ষা, হাসপাতালের ত’থ্যে ভু’ল ও অস্পষ্টতা দেখা যাচ্ছে। ত’থ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে ক’রোনা নি’য়ন্ত্রণ উদ্যোগ বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে।

ম’হামা’রি পরিস্থিতি মূ’ল্যায়ন, প্রক্ষেপণ, নীতিনির্ধারণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সঠিক ত’থ্য দরকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আট সদস্যবিশিষ্ট পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্য আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘আপনি ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী (পিপিই) কিনতে চান।

কেনার আগে জানতে হবে কতজন চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর পিপিই দরকার। এর জন্য একধরনের ত’থ্য দরকার। আবার ম’হামা’রি বি’ষয়ে প্রক্ষেপণের জন্যও ত’থ্য দরকার। কিন্তু সঠিক ত’থ্য পাওয়া যাচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ভবি’ষ্যতের কোনো ম’হামা’রি মো’কাবিলার জন্য বর্তমান ম’হামা’রির ত’থ্য সংরক্ষণ করা জরুরি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ক’রোনাযু’দ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অ’স্ত্র হচ্ছে রো’গতাত্ত্বিক ত’থ্য। বাংলাদেশের এই অ’স্ত্রটি দু’র্বল।

পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটি সমস্যাটি প্রায় দেড় মাস আগে ধরতে পারে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানায়। কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়নি। এখন এই ত’থ্যের ভিত্তিতে জে’লাভিত্তিক কোনো পরামর্শ দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশে ক’রোনাবি’ষয়ক স’রকারি ত’থ্যের প্রধান উৎস তিনটি। রো’গতত্ত্ব, রো’গনি’য়ন্ত্রণ ও গবে’ষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) শুরু থেকে ক’রোনাবি’ষয়ক ত’থ্য জানাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সমন্বিত নি’য়ন্ত্রণকক্ষ প্রতিষ্ঠার পর এই কক্ষ থেকে গণমাধ্যমে ত’থ্য দেওয়া শুরু হয়।

এখন যে নিয়মিত সংবাদ বু’লেটিন প্রচারিত হয়, তার ত’থ্য এই কক্ষ থেকে সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়া স’রকার ক’রোনাবি’ষয়ক corona.gov.bd ওয়েবসাইট চালু করেছে। তাতেও ক’রোনাবি’ষয়ক ত’থ্য প্রকাশ করা হচ্ছে। এই তিন উৎস থেকে পাওয়া ত’থ্যে অসংগতি দেখা যায়।

আইইডিসিআর ঢাকা বিভাগসহ আটটি বিভাগের সব জে’লার এবং ঢাকা শহরের ত’থ্য তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে আসছে। ১৩ জুন তারা বলেছিল, ঢাকা শহরে মোট রো’গী ২৩ হাজার ৩৯৯ জন।

অন্যদিকে ২২২টি এলাকার মোট রো’গী ছিল ১৩ হাজার ১৫৬ জন। তখন আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা বলেছিলেন, ত’থ্য সংগ্রহের সময় বিস্তারিত ঠিকানা না লিখে শুধু ঢাকা লেখার কারণে এটা হয়ে থাকতে পারে।

ত’থ্যের এই সীমাবদ্ধতা প্রভাব ফে’লেছে ক’রোনা প্রতিরোধ কর্মকাণ্ডে। স’রকার ঢাকা শহরে রো’গী ও জনসংখ্যার অনুপাতের ভিত্তিতে লাল, হলুদ ও সবুজ এলাকা চিহ্নিত করেছে।

শোনা যাচ্ছে, ছোট ছোট এলাকা ধরে লকডাউন করা হবে। এই লকডাউন পরিকল্পনার স’ঙ্গে জ’ড়িত ব্যক্তিরা এলাকার সঠিক ত’থ্য পাচ্ছেন না। সি’দ্ধান্ত নিতেও তাই বিলম্ব হচ্ছে।

মৃ’ত্যু অবহেলিত
এ পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ১২ হাজার ৩০৬ জন রো’গী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মা’রা গেছেন ১ হাজার ৪৬৪ জন। জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, এই ত’থ্য যথেষ্ট নয়। প্রথমত, জে’লাভিত্তিক কোনো মৃ’ত্যুর ত’থ্য নেই। দ্বিতীয়ত, কোন কোন হাসপাতালে মৃ’ত্যু বেশি হচ্ছে, সেই ত’থ্যও নেই। পরিস্থিতি জানার জন্য মৃ’ত্যুর আগে কতজন আইসিইউতে ছিলেন, ক’রোনার স’ঙ্গে আর কোনো রো’গ ছিল কি না—এসব ত’থ্য দরকার। এ রকম ত’থ্য কোনো দপ্তরে নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, ম’হামা’রি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করার জন্য ক’রোনা উপসর্গ নিয়ে কত মানুষের মৃ’ত্যু হচ্ছে, সেই ত’থ্য সংগ্রহ করা দরকার। কিন্তু স’রকারের কোনো দপ্তরে সেই উদ্যোগ নেই। ক’রোনা উপসর্গ নিয়ে মৃ’ত্যুর ত’থ্য একাধিক দৈনিক সংবাদপত্র নিয়মিত প্রকাশ করে আসছে। কিছু তরুণ শিক্ষার্থীদের ১১ জনের একটি দলও এ নিয়ে কাজ করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও একটি উদ্যোগ আছে। নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে।

পরীক্ষায় গোলমাল
রো’গ শনাক্তকরণ পরীক্ষা নিয়ে মানুষের অসন্তুষ্টি প্রায় শুরু থেকে। এখন স’ন্দে’হ দেখা দিয়েছে এর ত’থ্য নিয়ে। যেসব রো’গী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরছেন বা যেসব রো’গী বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হচ্ছেন, তাঁদের প্রত্যেকেরই রো’গ শনাক্তকরণ পরীক্ষা করতে হয়।

একই পরীক্ষা ২৪ ঘণ্টায় দুবার করতে হয়। প্রথম পরীক্ষায় ঋ’ণাত্মক হলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দ্বিতীয় পরীক্ষার দরকার হয় না। পরীক্ষা চিকিৎসকের পরামর্শে পরে করা হয়। পরীক্ষা করানোতে সমস্যা হওয়ায় ৩ মে বলা হলো, রো’গ নিরাময়ের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য এই পরীক্ষা না করালেও চলবে। কিন্তু অনেকেই পরীক্ষা করাচ্ছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছে, গতকাল রোববার পর্যন্ত ৪৫ হাজার ৭৭ জন সুস্থ হয়েছেন। এঁদের মধ্যে কতজনের দুবার পরীক্ষা হয়েছে, তার ত’থ্য নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। যাঁদের পরীক্ষা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে কতজনের পজিটিভ হয়েছে, সেই ত’থ্যও নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্র বলছে, দৈনিক শনাক্ত হওয়া নতুন রো’গীর স’ঙ্গে এসব পজিটিভ রো’গীর সংখ্যা মিলিয়ে প্রকাশ করা হচ্ছে।

হাসপাতালের হাল
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নি’য়ন্ত্রণকক্ষ জানিয়েছে, রাজধানীতে ক’রোনা রো’গীর জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে ৭ হাজার ২৫০টি শয্যা প্রস্তুত। বাস্তবে প্রস্তুত নয়। যেমন উত্তর সিটি করপোরেশনের মহাখালী বাসস্ট্যান্ডের কাছে ডিএনসিসি মার্কে’টে দেড় হাজার শয্যার আইসোলেশন সেন্টার ও চিকিৎসক-নার্সদের জন্য ২৫০ শয্যার হাসপাতালের ত’থ্য ওই হিসাবের মধ্যে আছে। বাস্তবে এই আইসোলেশন কেন্দ্র ও হাসপাতাল এখনো তৈরি হয়নি।

একটি বেস’রকারি হাসপাতালের ২০০ শয্যাকে প্রস্তুত বলে দেখানো হয়েছে, বাস্তবে সেই হাসপাতাল চিকিৎসা দিচ্ছে না।

ব্যাখ্যা নেই
শনাক্ত হওয়া রো’গীদের বড় অংশটি বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নেয়। বাড়িতে থেকে অনেক মানুষ সুস্থ হচ্ছেন। কিন্তু বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিয়ে কত মানুষ সুস্থ হচ্ছেন, তা নিয়মিত জানায় না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। হঠাৎ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১৫ জুনের সংবাদ বু’লেটিনে বলা হয়, ৩৪ হাজার ২৭ জন রো’গী সুস্থ হয়েছেন, এর আগের দিন এই সংখ্যা ছিল ১৮ হাজার ৭৩০। কিন্তু বলা হয়নি বাড়িতে কতজন সুস্থ হয়েছে বা বাড়িতে সুস্থ হওয়ার ত’থ্য স’রকার পেল কীভাবে।

ফলাফল ও করণীয়
জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, আস্থাহীন পরিবেশ ম’হামা’রি নি’য়ন্ত্রণের সহায়ক হতে পারে না। এর ফলে মানুষ স’রকারের ভালো উদ্যোগেও সাড়া দিতে দ্বিধা করতে পারে। লকডাউন বা যেকোনো উদ্যোগে মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হলে সঠিক ত’থ্য দিতে হবে। ম’হামা’রি পরিস্থিতি বুঝতে কী কী ত’থ্যের প্রয়োজন, তার সুনির্দিষ্ট ছক আছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার।

ত’থ্যের ব্যাপারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘ত’থ্য লুকানো বা ত’থ্যে বিচ্যুতি ঘটানো স্বাস্থ্য বিভাগের দীর্ঘদিনের প্রবণতা। তারই ধারাবাহিকতা ম’হামা’রির সময়েও অব্যাহত আছে। জবাবদিহি না থাকার কারণে এটা হয়েছে।’ তিনি বলেন, সঠিক ত’থ্য না থাকলে জনমনে বিভ্রান্তি, স’ন্দে’হ সৃষ্টি হয়। মানুষ স’রকার তথা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ও’পর আস্থা হারাচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here