‘জাস্ট গো’ ইউটিউব চ্যানেলে কক্সবাজার এলাকার ইয়াবার আদ্যোপান্ত তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন সে’নাবা’হিনীর মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্ম’দ রাশেদ খান। টানা কয়েক দিন ইয়াবা বাণিজ্যের নেপথ্য কাহিনি নিয়ে ডকুমেন্টারি তৈরি করছিলেন মেজর সিনহা।

কোনো ধরনের ঝঞ্ঝা ছাড়াই সময় পার করছিলেন। তবে শেষ মুহূর্তে টেকনাফের ওসি প্রদীপ কুমার দাশের সাক্ষাৎকার রেকর্ড করাটাই কাল হয়ে দাঁড়ায় মেজর সিনহার জন্য।

প্রত্যক্ষদর্শী ও একাধিক সূত্র অনুযায়ী, ক্র’সফা’য়ারের নামে নৃ’শংসভাবে খু’ন করা অসংখ্য মানুষের র’ক্তে রঞ্জিত প্রদীপ কুমারও ভিডিও সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় বারবারই কেঁপে ওঠেন। মেজর সিনহার ত’থ্যবহুল প্রশ্নের পর প্রশ্নে চ’রম অস্বস্তিতে পড়েন প্রদীপ।

নানা অজুহাতে ভিডিও সাক্ষাৎকার এড়ানোর সব কৌশল খাটিয়েও ব্যর্থ ওসি প্রদীপ বা’ধ্য হয়েই প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে থাকেন, ভিডিওচিত্রে মেজরের উদ্্ঘাটন করা নানা ত’থ্যের সামনে সীমাহীন নাস্তানাবুদ হন তিনি। ক্র’সফা’য়ারে অতিমাত্রায় উৎসাহী ওসি প্রদীপ ও তার সহযোগীরা ইয়াবা বাজারজাত এবং পা’চারের ক্ষেত্রেও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভূমিকার কথা স্বীকার করতে বা’ধ্য হন।

এদিকে থানা থেকে মেজর সিনহা বেরিয়ে যেতেই ওসি প্রদীপ অচিরেই বড় রকমের বি’পদের আ’শঙ্কায় তৎক্ষণাৎ কক্সবাজারের এসপি মাসুদকে ফোন করে বিস্তারিত জানিয়ে দেন। সব শুনে এসপি নিজেও উ’দ্বি’গ্ন হয়ে পড়েন।

কয়েক মিনিটেই এসপির নির্দেশনায় তৈরি হয় ?মেজর সিনহার নৃ’শংস হ’ত্যার নিন্ডিদ্র পরিকল্পনা। আলাপ-আলোচনা শেষে এসপি-ওসি এমনভাবেই ত্রিমুখী মার্ডার মিশন সাজিয়েছিলেন- সেই ফাঁদ থেকে মেজর সিনহা মোহাম্ম’দ রাশেদ খানের প্রা’ণে বাঁচার কোনো সুযোগই ছিল না।

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চলচ্চিত্রের ফাইটিং গ্রুপের পরিচালক ইলিয়াস কোবরাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, আতিথেয়তার নামে নানা কৌশলে সন্ধ্যা পর্যন্ত মেজর সিনহাকে তার নিভৃত পাহাড়ি গ্রামে আ’টকে রাখার। চলচ্চিত্রের স’ঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার পরিচিতি থাকলেও ইলিয়াস কোবরা ইদানীং ?‘ক্র’সফা’য়ার মিটমীমাংসার দালালি’ কাজেই সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন।

ক্র’সফা’য়ারের তালিকায় নাম থাকার গুজব ছড়িয়ে অসংখ্য মানুষকে গো’পনে ওসি প্রদীপের স’ঙ্গে সমঝোতা করিয়ে দিয়ে টেকনাফের শীর্ষ দালাল হিসেবে বেশ নামডাক ছড়িয়ে পড়েছে কোবরার। তবে ক্র’সফা’য়ারের কবল থেকে জীবন বাঁচানোর সমঝোতায় ওসি প্রদীপ হাতিয়ে নিয়েছেন ১০ লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে দালালির কমিশন হিসেবে ইলিয়াস কোবরাকেও মাথাপিছু এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা পাইয়ে দিয়েছেন প্রদীপ।

ওসিসহ পু’লিশ প্রশাসনের কাছে পরীক্ষিত দালাল ইলিয়াস কোবরা ঠিকই তার ও’পর অর্পিত দায়িত্ব অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। মারিসঘোনায় নিজের বাগানবাড়ী ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখানোর নামে ইলিয়াস কোবরা সেদিন বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত নির্জন পাহাড়েই নিজ হেফাজতে রেখেছিলেন মেজর সিনহাকে।

এ সময়ের মধ্যে মেজরের অবস্থান, কতক্ষণ পর কোন রাস্তায় কোথায় যাবেন সেসব ত’থ্য জানিয়ে কোবরা ৯টি এসএমএস পাঠান ওসিকে। পরিকল্পনামাফিক সন্ধ্যা ৭টার দিকে টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ তার পছন্দের দুই এসআই ও দুই কনস্টেবল নিয়ে নিজের সাদা নোহায় এবং আরও পাঁচ-সাতজন পু’লিশ সদস্য অপর একটি মাইক্রোবাসে হন্ত’দন্ত অবস্থায় থানা থেকে মেরিন ড্রাইভওয়ে ধরে উত্তর দিকে ছুটতে থাকেন।

ওসি বাহিনী বাহারছড়া-কক্সবাজারের পথে শামলাপুর পু’লিশ ক্যাম্পে যাওয়ার পথেই ইলিয়াস কোবরার নতুন খবর আসে। ওসি প্রদীপকে ফোন করে তিনি জানান, এ মুহূর্তে মেজর সিনহা ও তার ভিডিওম্যান সিফাত মারিসঘোনার পাহাড়চূড়ায় উঠছেন। পাহাড়ের ও’পর থেকে মেরিন ড্রাইভওয়ে, টেকনাফ সদর, নাফ নদী-মিয়ানমার সীমান্ত এবং দক্ষিণ দিকে সমুদ্রের বিস্তীর্ণ অংশ দেখা যায়।

গভীর সমুদ্রের দিক থেকে ছোট-বড় ইঞ্জিনবোটগুলো সার্চলাইটের আলো ফে’লে ফে’লে সমুদ্রসৈকতের দিকে আসতে থাকে, আবার ডজন ডজন ইঞ্জিনবোট সৈকত ছেড়ে গভীর সমুদ্রের দিকে যেতে থাকে। পুরো দৃশ্যপটের ভিডিওচিত্র ধারণ করাটাই হচ্ছে তার ডকুমেন্টারির শেষ দৃশ্য।

ইলিয়াস কোবরা ফোনে প্রদীপকে জানান, মেজর সাহেব পাহাড় থেকে নেমে কিছু সময়ের জন্য মেরিন ড্রাইভওয়ে ব্যবহার করে টেকনাফের দিকে যেতে পারেন, তারপর সেখান থেকে ফিরে যাবেন হিমছড়ির রিসোর্টে। এটুকু শুনেই ওসি প্রদীপ তার গাড়ি থামিয়ে দেন বাহারছড়া পৌঁছানোর আগেই। মারিসঘোনা থেকে টেকনাফ যাওয়ার পথে তিন কিলোমিটার দূরের বড়ডিল নামক স্থানে ওসি ও তার স’ঙ্গীদের সবাই দুটি মাইক্রো থামিয়ে পূর্ণ প্রস্তুতিতে অপেক্ষমাণ থাকেন।

এর মধ্যেই ওসি প্রদীপ কুমার মারিসঘোনা এলাকার দুজন সোর্স ছাড়াও ক্র’সফা’য়ার বাণিজ্যের টাকা সংগ্রহকারী এজেন্ট বলে কথিত আবদুল গফুর মেম্বার, হাজী ইসলাম, মুফতি কেফায়েতউল্লাহ ও হায়দার আলীকে ফোন করে জানান, মারিসঘোনা পাহাড়ের চূড়ায় বেশ কয়েকজন ভ’য়ঙ্কর স’ন্ত্রাসী বিপুল পরিমাণ অ’স্ত্রশস্ত্র নিয়ে জড়ো হয়েছে।

তারা কেউ পাহাড় থেকে নামার চেষ্টা করলেই যেন এলাকার লোকজনকে স’ঙ্গে নিয়ে ‘ডাকাত, ডাকাত’ চি’ৎকার জুড়ে দেওয়া হয় এবং যাদের হাতেনাতে পাওয়া যাবে তাদেরই যেন গণপি’টুনি দিয়ে মে’রে ফেলা হয়। বাকি সবকিছু ওসি দেখবেন এবং এ জন্য তিনি মারিসঘোনার দিকে রওনা দিয়েছেন বলেও জানানো হয় তাদের।

ওসির কাছ থেকে পাওয়া এমন খবর ওসির এজেন্টরা পাহাড়-সংলগ্ন চারপাশের বেশ কয়েকটি বাড়িঘরে ছড়িয়ে দিয়ে লা’ঠিসোঁটায় সজ্জিত হয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু চৌকস সে’না অফিসার সিনহা পাহাড়ের চূড়ায় থাকাবস্থায়ই চারপাশে সাজ সাজ রব দেখে সতর্ক হয়ে ওঠেন এবং এ কারণেই টর্চলাইট না জ্বা’লিয়ে অন্ধকারের মধ্যেই ধীর লয়ে পাহাড় থেকে নিচে নেমে আসেন।

ঠিক তখনই বেশ কিছুসংখ্যক গ্রামবাসী ‘ডাকাত, ডাকাত’ চি’ৎকার জুড়ে দিয়ে তাদের চারপাশ থেকে ধা’ওয়া দিতে থাকে। কিন্তু মেজর সিনহা তার সহযোগীর হাত চে’পে ধরে প্রশিক্ষণের দক্ষ’তা ও অ’ভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েই প্রায় আধা কিলোমিটার জায়গা পেরিয়ে পাকা সড়কে পৌঁছে যান এবং দ্রু’ত নিজের গাড়িতে উঠেই উত্তর দিকে হিমছড়ির দিকে রওনা হন। বাহারছড়ার মারিসঘোনা থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরেই শামলাপুরের সেই পু’লিশ চেকপোস্ট। ওসির নির্দেশে যেখানে এসআই লিয়াকতসহ একদল পু’লিশ আরও আগে থেকেই ওতপেতে ছিল, সেখানেই পৌঁছে যায় মেজর সিনহার গাড়িটি। গাড়িটির খুব কাছে অ’স্ত্র তাক করে মেজরকে হাত তুলে সামনের দিকে মুখ করে আসার নির্দেশ দেন লিয়াকত। আর গাড়ি থেকে নামতেই অব্যর্থ নিশানায় লিয়াকত পর পর চারটি বু’লেট বিদ্ধ করেন মেজর সিনহার দে’হে। ফলে লু’টিয়ে পড়েন মেজর। এদিকে বড়ডিল এলাকায় অপেক্ষমাণ ওসি বাহিনী মেজরের উত্তর দিকে রওনা দেওয়ার খবর শুনেই শামলাপুর ক্যাম্পের দিকে রওনা দেয়, যে কারণে লিয়াকতের গু’লিতে মেজর মাটিতে লু’টিয়ে পড়ার ১৫-১৬ মিনিটের মধ্যেই ওসি বাহিনী সেখানে পৌঁছাতে স’ক্ষম হয়। কারণ টেকনাফ থানা থেকে শামলাপুর চেকপোস্ট পর্যন্ত যেতে প্রাইভেটকারে ৪০-৪৫ মিনিট সময় লাগে। কিন্তু তিনি মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরের বড়ডিল এলাকায় থাকায় ১৫-১৬ মিনিটেই চেকপোস্টে পৌঁছেই মেজর সিনহার লু’টিয়ে পড়া দে’হ পা দিয়ে চে’পে ধরে নিজের আ’গ্নেয়াস্ত্র থেকে পর পর দুটি গু’লি বর্ষণ করে লা’থি মে’রে নিথর দে’হখানা রাস্তার ধারে ফে’লে দেন ওসি প্রদীপ। ত্রিমুখী হ’ত্যা মিশনের ব্যাখ্যা দিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একদিকে মারিসঘোনা গ্রামে ওসি প্রদীপের নিজস্ব এজেন্টদের দ্বারা ‘ডাকাত, ডাকাত’ চি’ৎকার জুড়ে গণপি’টুনি দিয়ে হ’ত্যার পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু সেখান থেকে জীবন বাঁচিয়ে মেজর সিনহা যদি টেকনাফের দিকে রওনা হতেন, তাহলে তিন কিলোমিটার সামনে বড়ডিলে পৌঁছেই তিনি ওসি বাহিনীর নির্বিচার গু’লিতে বেঘোরে জীবন হারাতেন। অন্যদিকে মেজর তাৎক্ষণিক সি’দ্ধান্তে হিমছড়ি রিসোর্টের দিকে রওনা দিলেও শামলাপুরে তার জীবন কেড়ে নিতে এসআই লিয়াকতের টিমকেও পূর্ণ প্রস্তুতিতে রাখা হয়। আসলে কোনো বিকল্প উপায় অবলম্বন করেই যেন মেজর সিনহা প্রা’ণ নিয়ে ফিরতে না পারেন তা শতভাগ নিশ্চিত করেই পাকা পরিকল্পনা আঁটেন এসপি মাসুদ। ওসি প্রদীপের নেতৃত্বে তা বাস্তবায়িত হয়েছে অব্যর্থভাবেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here