মায়ের নিরলস চেষ্টায়- গ্রামের কর্দমাক্ত মেঠোপথ। আষাঢ়ের টিপ টিপ বৃষ্টি। লোকজনের চলাফেরা খুব একটা নাই। একহাতে ছাতা অন্য হাতে ৫/৬ বছরের একটা জীর্ন-শীর্ন ছেলেকে টেনে নিয়ে পথ চলছেন ঘোমটা পড়া এক না’রী।

সময় এবং হাতে বই দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে অনিচ্ছুক ছেলেকে স্কুলে নিতে চেষ্টা চলছে। স্কুলের কাছাকাছি গিয়ে মা আর যেতে পারছেন না। কাকুতি মিনতি করে বুঝিয়ে ছেলেকে স্কুলের দিকে ঠেলে পাঠিয়ে করুন চোখে তাকিয়ে আছেন মা।

ছেলে দৃষ্টির অন্তরালে চলে গেলে ধীরে ধীরে পুরনো পথে হাঁটছেন হতাশাক্লিষ্ট মা। তবে কি গণকের কথাই ঠিক-‘এই ছেলের হাতের রেখা বলছে কপালে বিদ্যা নাই।’

আশেপাশের কয়েক গ্রামের অনেক ছেলেমে’য়ের বাংলা এবং আরবী শিক্ষার হাতেখড়ি হয়েছে তাঁর হাতে। ভাগ্যের নি’র্মম পরিহাস একমাত্র ছেলে নিরক্ষর থাকবে। সামান্য পথও আর শেষ হতে চায় না। বারবার আঁচল দু’চোখ স্পর্শ করছে। একটু পরে মায়ের দু’চোখে শ্রাবণের বৃষ্টি ঝরে। বাড়ীর অদূরে বই হাতে ফিরে এসেছে ছেলে, স্কুলে যায় নি।

এক সময় ছেলেটা ক্লাসে ফার্স্ট হতে শুরু করে। ফাইভে বৃত্তি পরীক্ষা দেয়। দু’দশ গ্রামে পঞ্চাশ বছরে কেউ বৃত্তি পায় নাই। ছেলেটা প্রাথমিক বৃত্তি পায়। সুনাম ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। মায়ের চোখ বার বার ভিজে যায়-আ’নন্দে। স্কুলে বেতন দিতে হয় না, উল্টো ছেলে স’রকারী টাকা পায়। টানাটানির সংসারে এর চেয়ে সু’খের আর কি থাকতে পারে।

জুনিয়র বৃত্তি পাবে জানাই ছিল। পরীক্ষার হলে ইনভিজিলেটর খাতা পড়েই বলে দেয়, ছেলেটা ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাবে। সবার অনুমান মায়ের আশা-তাতো আর মিথ্য হতে পারে না।

মা কিছুতেই নয়নের মনি একমাত্র ছেলেকে দূরে যেতে দেবেন না। স্থানীয় কলেজ থেকে পাশ করে ছেলে গ্রামের স্কুলের মাষ্টার হয়ে মায়ের চোখের সামনে থাকবে।

ছেলে বেঁকে বসে, ঢাকা কলেজে পড়বে। মা কিছুতেই রাজী না। স্বল্প শিক্ষিত বাবা অবশ্য ছেলের পক্ষ নেন। ছেলে এসএসসি পাশ করে।

এবার সত্যিই কলেজে ভর্তির পালা আসে। বাবা-ছেলে মিলে মাকে বোঝায়। সহজ সরল বাবা ভিতরে ভিতরে অনেকটাই নার্ভাস। ঢাকায় অনেক খরচ, কি করে চালাবেন। নিজের জীবনের চেয়েও আদরের ছেলে। ছেলের খুশিই তো মায়ের খুশী। মা রাজী হন। বাবা-মা সংসারের আর্থিক টানাপোড়ন নিয়ে আড়ালে আবডালে আলোচনা করেন। মে’য়েদেরও লেখাপড়া করাচ্ছেন।

গ্রামের কেউ কেউ মে’য়েদের পড়াশুনা বন্ধ করার পরামর্শ ও দেয়। মা-বাবা সাড়া দেন না। ছেলেটি ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়ে যায়। প্রতি সপ্তাহে চিঠি লেখেন মা। প্রতিমাসেই ছেলে বাড়ি আসে। কলেজে ছেলের বেতন লাগে না। তবে থাকা-খাওয়ার খরচ তো আছে।

কখনো ধান-পাট, কখনো বা সুদে ধার করে ছেলের খরচ দেন। কোন কোন সময় জমি বন্ধক রেখেও টাকা দিতে হয়। ছেলে কলেজ শেষ করে। রেজাল্ট দেখে সবাই বোঝে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চান্স হবে। বাড়িতে গেলে ছেলে মাকে বোঝায় ইংরেজির প্রফেসর হবে। ইংরেজিতে ভর্তিও হয়ে যায়। ইতোমধ্যে বড় মে’য়ে পাশ করে স্কুলে মাস্টারি নিয়েছে। স্বা’মীর ঘর করলেও সংসারে কমবেশি সাহায্য করে। ছেলে হলে থাকে, মাঝে মাঝে টিউশনি করে।

বাসায় বাসায় কলিং বেল টি’পে পরের ছেলে মে’য়ে পড়াতে কার ভাল লাগে, তবুও করতে হয়। মাঝে মাঝে টিউশনি ছেড়ে দেয়, মাকে চিঠি লেখে। এর ওর হাত দিয়ে বাড়ি থেকে টাকা আসে। সাথে মাত্রা টেনে টেনে গোটা হাতে লেখা মায়ের চিঠি ‘টাকার চিন্তা করিও না, ভিটে বাড়ি বিক্রি করে হলে ও তোমাকে পড়াব’। ছেলে আবার টিউশনি খুঁজে নেয়।

গুলশান-বনানীতে ধ’নী লোকের বাড়িতে পড়াতে গিয়ে ভাবে তাঁর নিজে ছেলে মে’য়েরাও কি এসব বাড়িতে টিউশনি করবে। স’রকার পতনের দাবীতে হরতাল অ’বরোধ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে, হল ভ্যাকান্ট হয়, সেশন জট, অনার্স পাশ হয় না। বন্ধক কিংবা বিক্রি করতে করতে চাষের জমি কমে এসেছে।

তবুও নিয়মিত বাড়ী থেকে টাকা আসে। পাশের রুমের সিনিয়র ভাই বিসিএস দিয়ে পু’লিশের এএসপি পদে নির্বাচিত হয়েছে। হলের সিনিয়র-জুনিয়র সকলেই সালাম দেয়, সামনে কিংবা আড়ালে তাঁর উজ্জ্বল ভবি’ষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করে। এএসপির এতো সন্মান, ছেলেটা মনে মনে সংকল্প করে সেও এএসপি হবে।

ঘোড়ার আগে গাড়ি কেনার মতই গো’পনে গো’পনে বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে। পরীক্ষার সার্কুলার হয়, পরীক্ষায় অংশগ্রহণের যোগ্যতাও ইতোমধ্যে হয়ে গিয়েছে। ফার্স্ট চয়েজ পু’লিশ দিতে চায়। চৌদ্দ গোষ্ঠির মধ্যে কেউ পু’লিশের চাকরিতে নাই। পু’লিশে ঢুকলে গা’লিগা’লাজের ট্রেনিং করতে হয়, মানুষ ন’ষ্ট হয়ে যায়।

একমাত্র ছেলের এমন ভবি’ষ্যত মা কিছুতেই মেনে নেবেন না। ছেলের গো সে এএসপি হবে, এবারও সেই সহজ সরল বাবা এগিয়ে আসেন। একটির পর একটি ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্ত ফল বের হয়। পিএসসি’র টাঙানো নোটিস বোর্ডে প্রে’মিকাসহ ছেলেটি নিজের রোল নম্বর খুঁজতে থাকে। পু’লিশ ক্যাডারেই খোঁজে।

নিচের দিক থেকে খুঁজতে খুঁজতে না পেয়ে হতাশা বাড়তে থাকে। এতো হতেই পারে না, পরীক্ষা অনেক ভালো দিয়েছে। উপরের দিকে প্রথম রোলটা দেখে নার্ভাস হয়ে যায়, ভু’ল দেখছে না তো! প্রে’মিকাকে দেখতে বলে, নিজেও পকেট থেকে এ্যাডমিট কার্ড বের করে। না, সত্যিই রোল নম্বর মিলে যাচ্ছে! ছেলেটা প্রথম হয়েছে! পরের দিন বাড়িতে ফিরে যায়, অনেকক্ষন মায়ের পাশে বসে থাকে। স্বপ্নের চাকুরীতে জয়েন করে। দিন, মাস, বছর গড়ায়। ধাপে ধাপে ছেলেরও পদ বাড়ে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here