তসলিমা নাসরিন: কত কিছুর দিবস যে পালিত হচ্ছে। শুনলাম কাল নাকি ‘কন্যা দিবস’ ছিল। জানি না পুত্র দিবস বলে কোনো দিবস আছে কিনা। আসলে পুত্র দিবস তো প্রায় প্রতিদিনই পালিত হয়।

কন্যা যেহেতু অনেক সংসারেই অ’বহেলিত, তাই কন্যাকে মূ’ল্য দেওয়ার জন্য, আমার ধারণা, একটি দিবস তৈরি করা হয়েছে।

আমার কন্যাও নেই, পুত্রও নেই। যৌ’বনে অনেক ভু’ল সি’দ্ধান্ত নিলেও স’ন্তান না জ’ন্ম দেওয়ার সি’দ্ধান্তটি আমার সঠিক ছিল।

৭৮০ কোটি লোকে পৃথিবী উপচে পড়ছে, এই দুঃসময়ে জনসংখ্যা বাড়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই। যারা জ’ন্মেছে তারা কি সবাই খেতে পরতে পাচ্ছে, শিক্ষা স্বা’স্থ্য পাচ্ছে?

কিছু মানুষ, আমার অবাক লাগে, মনে করে স’ন্তান জ’ন্ম না দিলে তাদের জীবনই ব্যর্থ, অর্থহীন। তারা স’ন্তানের জন্য ইতর প্রা’ণীদের মতো কিলবিল করা ইচ্ছের আম’দানি করে।

আমার এক মামাতো বোন উচ্চশিক্ষিতা, নামী কলেজের অধ্যাপিকা, কিন্তু স’ন্তান নেই বলে এমনই দুঃখে ক’ষ্টে ডুবে থাকে যে তার জীবনটিই সে উপভোগ করে না। তার এমন অর্থপূর্ণ জীবনটিকে সে যে অর্থহীন মনে করছে,

এ দোষ কার বা কাদের? তার কানের কাছে যারা শৈশব থেকে গুনগুন করেছে স’ন্তান না জ’ন্মালে জীবনের কোনো মানে নেই, দোষ নিশ্চয়ই তাদের অনেকটা, বাকি দোষ তাদেরও যারা যুক্তি বুদ্ধি দিয়ে না’রীবিদ্বেষী রীতিগুলোকে ভাঙার কোনো চেষ্টা করে না।

প্রজাতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যদি প্রজননের প্রয়োজন পড়তো, কথা ছিল। এখন তো দেখা যাচ্ছে মানুষের আধিক্য একটা ভ’য়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। লক্ষ কোটি অরণ্য-নির্ভর প্রা’ণীর আবাসস্থল উড়িয়ে দিয়ে মানুষের জন্য শহর নগর বানাতে হয়েছে।

পৃথিবীর কত প্রজাতি যে আমাদের মানুষ-প্রজাতির হিং’স্রতা আর বোধবুদ্ধিহীনতার কারণে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এই গ্রহে আমাদের যতটা অধিকার, ততটা অধিকার তো তাদেরও।

অ’স্ত্রের জো’রে কী অরাজকতাই না আমরা চা’লিয়েছি! আমরা পৃথিবীর বন-জঙ্গল ধ্বং’স করেছি, নদী সমুদ্র আকাশ বাতাস দূষিত করেছি আমাদের স্বার্থান্ধ জীবন-যাপন এবং আমাদের অর্থহীন জনসংখ্যা দিয়ে।

অনেকে মনে করেন, জ্ঞানীগুণীদের স’ন্তান জ’ন্ম দেওয়া উচিত। কিন্তু বারবার প্রমাণিত হয়েছে, জ্ঞানীগুণীদের স’ন্তান জ্ঞানীগুণী হয় না। আর কত প্রমাণ দরকার! মৃ’ত্যুতেই জীবনের চিরকালীন সমাপ্তি। বংশ রয়ে গিয়ে, র’ক্তের ছিটেফোঁটা রয়ে গিয়ে কারও কোনো লাভ হয় না।

আজ এতকাল পরও নিজেকে আরেকবার ধ’ন্যবাদ দিই, না পুত্র না কন্যা কিছুই জ’ন্ম না দিয়ে আমি একটি স্বাধীন এবং অর্থপূর্ণ জীবন-যাপন করেছি বলে।

তুমি স’ন্তান জ’ন্ম দিয়ে জীবনকে অর্থপূর্ণ করার চেষ্টা কোরো না। তুমি তোমার কাজ দিয়ে জীবনকে অর্থপূর্ণ করো। তুমি কে, তুমি কী সেটাই বড়। স’ন্তান যে কেউ জ’ন্ম দিতে পারে, যে কোনো গণ্ডমূর্খই, এ কোনো উল্লেখযোগ্য ব্যাপার নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here